নিরাপদ ঘুম ও শিশুকে উষ্ণ রাখা (ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার সহ)
শিশুকে সবসময় চিত করে, শক্ত ও সমান আলাদা জায়গায় ঘুম পাড়ান, আর নবজাতককে উষ্ণ রাখুন; ছোট বা আগে জন্মানো শিশুর জন্য ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার জীবন বাঁচায়।
নবজাতক নিজের শরীর নিজে ভালোভাবে গরম রাখতে পারে না, তাই সহজেই ঠান্ডা হয়ে যায়। আবার ঘুমের সময় ভুল অবস্থানে বা নরম বিছানায় শোয়ালে শ্বাস আটকে যাওয়ার মতো বিপদ হতে পারে। ইউনিসেফ ও WHO-র কিছু সহজ নিয়ম মানলে এই দুই ঝুঁকিই অনেক কমানো যায়।
নিরাপদ ঘুমের সহজ নিয়ম
ইউনিসেফ বলছে, ঘুমের মধ্যে হঠাৎ, কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়া শিশুর মৃত্যু (সাডেন ইনফ্যান্ট ডেথ সিনড্রোম বা SIDS) বিরল, কিন্তু ঝুঁকি কমানো সম্ভব। প্রতিবার ঘুমের সময়, দিনে বা রাতে, মনে রাখুন:
- চিত করে শোয়ান। প্রতিটি ঘুমে শিশুকে পিঠের ওপর শোয়ান, উপুড় করে নয়।
- খালি জায়গা। শিশুর ঘুমের জায়গায় বালিশ, পুতুল, খেলনা বা ঢিলে কাঁথা-কম্বল রাখবেন না।
- মাথা খোলা রাখুন। ঘুমের সময় শিশুর মাথা ঢাকবেন না, যাতে বেশি গরম না হয় বা দম আটকে না যায়। কাঁথা যেন শিশুর মুখ বা মাথা পর্যন্ত উঠে আসতে না পারে। ইউনিসেফ যুক্তরাজ্য বলছে, ঘরের ভেতরে শিশুকে টুপি পরানোর দরকার নেই। খুব ছোট বা আগে জন্মানো শিশুর মাথা উষ্ণ রাখা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে আপনার ডাক্তারের সাথে কথা বলুন।
- শক্ত ও সমান জায়গা। নরম গদি বা উঁচু-নিচু জায়গায় নয়, শক্ত ও সমতল জায়গায় শোয়ান।
- শিশুর নিজের আলাদা জায়গা। শিশুর জন্য আলাদা, পরিষ্কার ঘুমের জায়গা সবচেয়ে নিরাপদ।
- কাছে রাখুন। অন্তত প্রথম ছয় মাস শিশুকে মা-বাবার কাছাকাছি, একই ঘরে ঘুমাতে দিন।
শিশু নিজে নিজে চিত থেকে উপুড় আর উপুড় থেকে চিত হতে শিখে গেলে, সে নিজের পছন্দের অবস্থানে ঘুমাতে পারে। জেগে থাকার সময় বড়দের চোখের সামনে শিশুকে কিছুক্ষণ উপুড় করে খেলতে দিলে এতে সাহায্য হয়।
যেসব জিনিস এড়িয়ে চলবেন
- ধোঁয়া: ঘরে বা শিশুর আশপাশে কেউ যেন ধূমপান না করে, দিনে বা রাতে। গর্ভাবস্থায় বা জন্মের পর তামাকের ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকা শিশুর ঝুঁকি বেশি।
- সোফা বা চেয়ার: শিশুকে কোলে নিয়ে সোফা বা হাতলওয়ালা চেয়ারে কখনো ঘুমাবেন না। ঘুম পেলে শিশুকে তার নিজের জায়গায় শুইয়ে দিন।
- বেশি গরম বা বেশি ঠান্ডা: ঋতু অনুযায়ী জামা পরান। খুব বেশি কাপড় বা ভারী কাঁথা চাপিয়ে শিশুকে ঘামিয়ে ফেলবেন না।
মা-বাবার বিছানায় শিশু ঘুমালে। অনেক পরিবারে শিশু মা-বাবার সঙ্গে একই বিছানায় ঘুমায়, বা খাওয়ানোর সময় মা ঘুমিয়ে পড়েন। ইউনিসেফ যুক্তরাজ্যের পরামর্শ অনুযায়ী তখন:
- শিশুকে বালিশ থেকে দূরে রাখুন।
- শিশু যেন বিছানা থেকে পড়ে না যায়, বা গদি আর দেয়ালের ফাঁকে আটকে না যায়।
- কাঁথা-চাদর যেন শিশুর মুখ বা মাথা ঢেকে ফেলতে না পারে।
- শিশুকে বড়দের বিছানায় একা রেখে যাবেন না।
- একই বিছানায় অন্য শিশু বা পোষা প্রাণী রাখবেন না।
- শিশু খুব ছোট হয়ে বা সময়ের আগে জন্মালে একই বিছানায় ঘুমানো নিরাপদ নয়।
- মদ খেলে, বা ঘুম ঘুম ভাব আনে এমন কোনো ওষুধ বা মাদক নিলে শিশুর সঙ্গে ঘুমাবেন না।
- আপনি বা বিছানার অন্য কেউ ধূমপান বা ভেপ করলে শিশুর সঙ্গে ঘুমাবেন না।
এসব ক্ষেত্রে শিশুকে আপনার পাশে তার নিজের শক্ত, সমান, খালি জায়গায় শোয়ান।
বেশিরভাগ SIDS ছয় মাসের কম বয়সে ঘটে, তবে পরেও হতে পারে। তাই অন্তত এক বছর বয়স পর্যন্ত এই নিয়মগুলো মেনে চলুন। ইউনিসেফ আরও বলছে, বুকের দুধ খাওয়ানো শিশুকে SIDS থেকে সুরক্ষা দেয়, আর যত বেশি বুকের দুধ খাওয়ানো হয়, সুরক্ষা তত বেশি।
নবজাতককে উষ্ণ রাখবেন কীভাবে
WHO নবজাতককে ঠান্ডা থেকে রক্ষা করাকে জরুরি যত্নের অংশ বলে। এর জন্য:
- জন্মের পরপরই শিশুকে মায়ের খালি বুকে, ত্বকে-ত্বকে লাগিয়ে রাখুন।
- প্রথম গোসল জন্মের অন্তত ২৪ ঘণ্টা পর দিন।
- মা ও শিশুকে দিনরাত একসঙ্গে রাখুন, যাতে শিশু ঘন ঘন বুকের দুধ পায় আর মা সহজে খেয়াল রাখতে পারেন।
- শিশুর শরীরের তাপমাত্রা ৩৫.৫° সেলসিয়াসের নিচে নামলে সেটা বিপদ চিহ্ন।
ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার কী
ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার (কেএমসি) মানে শিশুকে মায়ের বুকে, ত্বকের সঙ্গে ত্বক লাগিয়ে, একটি কাপড় দিয়ে নিরাপদে আটকে রাখা (এমনভাবে, যাতে শ্বাস নিতে কোনো অসুবিধা না হয়), আর শুধু বুকের দুধ খাওয়ানো। WHO-র ২০২২ সালের নির্দেশিকা অনুযায়ী:
- যেসব শিশু সময়ের আগে (৩৭ সপ্তাহের আগে) জন্মায় বা যাদের জন্ম-ওজন ২.৫ কেজির কম, তাদের সবার জন্য কেএমসি নিয়মিত যত্ন হিসেবে পরামর্শ দেওয়া হয়।
- জন্মের পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শুরু করা উচিত, ইনকিউবেটারে আগে রাখার অপেক্ষা না করে।
- দিনে যত বেশি ঘণ্টা সম্ভব, কেএমসি দিন।
- মা না পারলে বাবা বা পরিবারের অন্য কেউও কেএমসি দিতে পারেন।
- বাঁধার সময় খেয়াল রাখুন, শিশুর শ্বাসের পথ যেন খোলা থাকে।
WHO জানায়, কেএমসি এই শিশুদের মৃত্যুর ঝুঁকি কমায়, সংক্রমণ ও শরীর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কমায়, আর খাওয়ানোয় উন্নতি আনে।
হাসপাতালে কেএমসি শুরু হলে স্বাস্থ্যকর্মীরা শিশুর অবস্থা নজরে রাখেন। বাড়িতে কেএমসি দিতে হলে WHO বলছে, শিশুর কোনো বিপদ চিহ্ন থাকা চলবে না। তাই ছোট বা আগে জন্মানো শিশুর যত্ন কীভাবে করবেন, তা ছুটির আগে হাসপাতালের নার্স বা ডাক্তারের কাছ থেকে শিখে নিন, আর নিয়মিত চেকআপে যান।
এই লেখা শুধু সাধারণ তথ্যের জন্য, ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শের বিকল্প নয়। সম্পূর্ণ সতর্কতা
সূত্র
- UNICEF Parenting – Baby sleep — UNICEF
- UNICEF Parenting – What is SIDS? — UNICEF
- UNICEF UK Baby Friendly Initiative – Caring for your baby at night and when sleeping — UNICEF
- WHO – Recommendations for care of the preterm or low-birth-weight infant (2022) — WHO
- WHO – WHO advises immediate skin to skin care for survival of small and preterm babies (15 Nov 2022) — WHO
- WHO – Recommendations on maternal and newborn care for a positive postnatal experience (2022) — WHO
- WHO – Recommendations on postnatal care of the mother and newborn (2013) — WHO
- WHO – Newborn mortality (fact sheet) — WHO