নবজাতকের বিপদ চিহ্ন: কখন দ্রুত হাসপাতালে যাবেন
নবজাতকের কিছু লক্ষণ দেখলে এক মুহূর্তও দেরি না করে হাসপাতালে যেতে হয়; লক্ষণগুলো চিনে রাখুন।
জন্মের পর প্রথম মাস, বিশেষ করে প্রথম সপ্তাহ, শিশুর জন্য সবচেয়ে ঝুঁকির সময়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে, নবজাতকের মৃত্যুর বেশিরভাগই হয় জীবনের প্রথম সপ্তাহে। কিছু বিপদ চিহ্ন চিনে রাখলে আর দ্রুত হাসপাতালে গেলে অনেক শিশুর জীবন বাঁচানো যায়।
WHO-র তালিকা: এই আটটি বিপদ চিহ্ন
WHO-র ২০২২ সালের প্রসব-পরবর্তী যত্নের নির্দেশিকায় নবজাতকের জন্য নিচের লক্ষণগুলোকে বিপদ চিহ্ন বলা হয়েছে। এর যেকোনো একটি থাকলেই শিশুকে দ্রুত ডাক্তার দেখাতে হবে। সবগুলো লক্ষণ একসঙ্গে দেখা দেওয়ার অপেক্ষা করবেন না, একটিই যথেষ্ট।
- ঠিকমতো খাচ্ছে না। শিশু বুক টানছে না, বা আগের মতো খাচ্ছে না।
- খিঁচুনি। হাত-পা বা শরীর বারবার কাঁপছে, ঝাঁকুনি দিচ্ছে, বা শরীর শক্ত হয়ে যাচ্ছে। আগে একবার হয়ে থাকলেও জানাতে হবে।
- দ্রুত শ্বাস। মিনিটে ৬০ বা তার বেশি বার শ্বাস।
- বুক দেবে যাওয়া। শ্বাস নেওয়ার সময় বুকের নিচের অংশ জোরে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে।
- নড়াচড়া নেই। শিশু নিজে থেকে একেবারেই নড়ছে না।
- জ্বর। শরীরের তাপমাত্রা ৩৭.৫° সেলসিয়াসের বেশি।
- শরীর ঠান্ডা। তাপমাত্রা ৩৫.৫° সেলসিয়াসের কম।
- জন্ডিস বা হলুদভাব। জন্মের প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যেকোনো হলুদভাব, অথবা যেকোনো বয়সে হাত ও পায়ের তালু হলুদ হয়ে যাওয়া।
বাড়িতে কীভাবে খেয়াল রাখবেন
- শ্বাস গোনা: শিশু শান্ত থাকলে, যেমন ঘুমের সময়, ঘড়ি ধরে পুরো এক মিনিট বুক বা পেটের ওঠানামা গুনুন। ৬০ বা তার বেশি হলে সেটা দ্রুত শ্বাস।
- তাপমাত্রা: বাড়িতে থার্মোমিটার থাকলে মাপুন। না থাকলে শিশুর পেট বা পিঠ ছুঁয়ে দেখুন, খুব গরম না খুব ঠান্ডা।
- হলুদভাব: দিনের আলোতে শিশুর চোখ, গা এবং হাত-পায়ের তালু দেখুন।
- খাওয়া ও নড়াচড়া: শিশু কতবার দুধ খাচ্ছে আর কতটা সজাগ থাকছে, খেয়াল রাখুন।
WHO-র নবজাতক বিষয়ক তথ্যপত্রেও খাওয়ার সমস্যা, নড়াচড়া কমে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, জ্বর, খিঁচুনি বা শরীর ঠান্ডা লাগাকে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে।
আরও কিছু লক্ষণ, যা অবহেলা করবেন না
শিশু-স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য WHO-র নির্দেশিকায় (IMCI) নবজাতক পরীক্ষার সময় আরও কয়েকটি বিষয় দেখতে বলা হয়েছে:
- নাভি লাল হয়ে যাওয়া বা নাভি থেকে পুঁজ বের হওয়া।
- ত্বকে অনেক বা বড় পুঁজভরা গোটা।
- শ্বাসের সঙ্গে গোঙানির মতো শব্দ।
- শুধু নাড়া দিলে নড়ে, বা নাড়া দিলেও নড়ে না।
এগুলো দেখলেও দেরি না করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যান।
বিপদ চিহ্ন দেখলে কী করবেন
- দেরি করবেন না। “দেখি সকাল পর্যন্ত” ভাববেন না। সঙ্গে সঙ্গে কাছের হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রওনা দিন।
- পরামর্শ দরকার হলে: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্য বাতায়নে ১৬২৬৩ (16263) নম্বরে ফোন করে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা ডাক্তারের পরামর্শ নিতে পারেন।
- জরুরি সাহায্য: অ্যাম্বুলেন্স, পুলিশ বা ফায়ার সার্ভিসের জন্য জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ (999) নম্বরে ফোন করুন।
- পথে: শিশুকে মায়ের বুকের সঙ্গে ত্বকে-ত্বকে লাগিয়ে উষ্ণ রাখুন। শিশু খেতে পারলে বুকের দুধ দিতে থাকুন।
সব নম্বর ও করণীয় এক জায়গায় পাবেন জরুরি অবস্থা পাতায়।
নিয়মিত চেকআপ ভুলবেন না
বিপদ চিহ্ন না থাকলেও নবজাতককে নিয়মিত স্বাস্থ্যকর্মীকে দেখানো জরুরি। WHO জন্মের পর অন্তত চারবার চেকআপের পরামর্শ দেয়:
- জন্মের প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে (বাড়িতে জন্ম হলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব)।
- জন্মের ২ থেকে ৩ দিনের (৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা) মধ্যে।
- ৭ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে।
- ষষ্ঠ সপ্তাহে।
প্রতিটি চেকআপে স্বাস্থ্যকর্মী এই বিপদ চিহ্নগুলো পরীক্ষা করেন। আর জাতীয় সময়সূচি অনুযায়ী শিশুকে টিকা দিতে নিয়ে যান। দেখুন: শিশুর টিকার সময়সূচি (ইপিআই)।
এই লেখা শুধু সাধারণ তথ্যের জন্য, ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শের বিকল্প নয়। সম্পূর্ণ সতর্কতা
সূত্র
- WHO – Recommendations on maternal and newborn care for a positive postnatal experience (2022) — WHO
- WHO postnatal care guideline – Summary list of recommendations (NCBI Bookshelf) — WHO
- WHO – Newborn mortality (fact sheet) — WHO
- WHO – Integrated Management of Childhood Illness (IMCI) chart booklet (March 2014) — WHO
- DGHS – স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ — DGHS
- National Emergency Service 999 (Government of Bangladesh) — Government of Bangladesh