নবজাতকের নাভি ও ত্বকের যত্ন
নবজাতকের নাভি পরিষ্কার ও শুকনো রাখুন, তাতে কিছু লাগাবেন না, আর জন্মের অন্তত ২৪ ঘণ্টা পর প্রথম গোসল দিন।
জন্মের পর নাড়ি কেটে দেওয়ার পর শিশুর পেটে নাড়ির ছোট একটা অংশ থেকে যায়। এই জায়গা দিয়ে জীবাণু ঢুকে সংক্রমণ হতে পারে, তাই একটু যত্ন দরকার। ভালো খবর হলো, যত্নটা খুব সহজ: পরিষ্কার রাখুন, শুকনো রাখুন।
নাভির যত্ন: পরিষ্কার আর শুকনো
নাভির যত্ন শুরু হয় প্রসবের সময় থেকেই। WHO-র নির্দেশিকা বলছে, প্রসবের জায়গা ও জিনিসপত্র পরিষ্কার হতে হবে, নাড়ি কাটতে হবে জীবাণুমুক্ত ব্লেড দিয়ে, আর যিনি প্রসব করাচ্ছেন তাঁর হাত সাবান-পানিতে ধোয়া থাকতে হবে। তাই সম্ভব হলে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর সাহায্যে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসব করান।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) নবজাতকের নাভির জন্য “পরিষ্কার ও শুকনো যত্ন” পরামর্শ দেয়। এর মানে:
- নাভি ধরার আগে সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে হাত ভালো করে ধুয়ে নিন।
- নাভির জায়গা শুকনো ও খোলা বাতাসে রাখার চেষ্টা করুন।
- নাভিতে প্রস্রাব-পায়খানা লেগে গেলে পরিষ্কার পানি দিয়ে আলতো করে মুছে, পরিষ্কার নরম কাপড়ে শুকিয়ে নিন।
- নাভি নিজে থেকেই শুকিয়ে যাবে। জোর করে টানবেন না।
নাভিতে কী লাগাবেন না। গ্রামে-শহরে অনেক জায়গায় নাভিতে নানা জিনিস লাগানোর চল আছে। WHO বিশেষভাবে সতর্ক করেছে যে গোবরের মতো ক্ষতিকর জিনিস নাভিতে লাগালে মারাত্মক সংক্রমণ হতে পারে।
- গোবর, ছাই, মাটি, তেল, হলুদ বা কোনো ঘরোয়া জিনিস লাগাবেন না।
- ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মী না বললে কোনো মলম বা ওষুধ লাগাবেন না।
বাংলাদেশে ক্লোরহেক্সিডিন: শুধু একবার, শুধু নাভিতে
বাংলাদেশের জাতীয় নির্দেশিকা অনুযায়ী, নাড়ি কাটার পরপরই নাভির গোড়ায় একবার ৭.১% ক্লোরহেক্সিডিন ডাইগ্লুকোনেট (যা ৪% ক্লোরহেক্সিডিন দেয়) লাগানো হয়। এরপর নাভি শুকনো রেখে যত্ন নিতে হয়, আর নাভিতে অন্য কিছু লাগানো যাবে না।
- স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসব হলে স্বাস্থ্যকর্মী এটা লাগান।
- বাড়িতে প্রসব হলে স্বাস্থ্যকর্মী বা পরিবারের কোনো সদস্য লাগাতে পারেন। সঙ্গে সঙ্গে লাগানো না গেলে জন্মের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে লাগাতে হবে।
চোখে কখনো নয়। WHO সতর্ক করেছে, এই ক্লোরহেক্সিডিনকে চোখের ড্রপ বা মলম ভেবে চোখে দেওয়ার ঘটনায় শিশুর চোখের মারাত্মক ক্ষতি, এমনকি অন্ধত্ব হয়েছে। এটা শুধু নাভিতে ব্যবহারের জন্য। ভুল করে চোখে লেগে গেলে দেরি না করে ডাক্তার বা হাসপাতালে যান। কতবার বা কীভাবে লাগাবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে আপনার ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীর সাথে কথা বলুন।
প্রথম গোসল কখন
জন্মের পরপরই শিশুকে গোসল করালে শরীর দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যেতে পারে। নবজাতকের জন্য ঠান্ডা লাগা বিপজ্জনক।
- WHO-র পরামর্শ: শিশুর প্রথম গোসল জন্মের অন্তত ২৪ ঘণ্টা পর দিন।
- পরিবারের রীতির কারণে তা সম্ভব না হলে অন্তত ৬ ঘণ্টা অপেক্ষা করুন।
- জন্মের সময় শিশুর গায়ে যে সাদা, মোমের মতো আস্তরণ থাকে, সেটা ঘষে তোলার দরকার নেই। WHO-র নির্দেশিকা এটা ত্বকে রেখে দেওয়ার উপকারিতার কথা বলে।
- গোসলের সময় কুসুম গরম পানি ব্যবহার করুন, তাড়াতাড়ি শেষ করুন, তারপর সঙ্গে সঙ্গে মুছে শুকিয়ে কাপড় পরিয়ে দিন।
শিশুকে উষ্ণ রাখার আরও উপায় জানতে পড়ুন: নিরাপদ ঘুম ও শিশুকে উষ্ণ রাখা।
ত্বকের সাধারণ যত্ন
- শিশুকে ধরার আগে সবাই হাত ধুয়ে নিন।
- শিশুর কাপড় ও বিছানা পরিষ্কার ও শুকনো রাখুন।
- ভেজা কাঁথা বা কাপড় দেরি না করে বদলে দিন।
- প্রতিদিন শিশুর ত্বক, বিশেষ করে নাভি ও ভাঁজের জায়গাগুলো একবার ভালো করে দেখে নিন।
- দিনের আলোতে শিশুর চোখ, গা আর হাত-পায়ের তালু দেখুন। হলুদ ভাব লাগলে সেটা গুরুত্ব দিন, কারণ প্রথম ২৪ ঘণ্টায় হলুদভাব বা যেকোনো সময় তালু হলুদ হওয়া বিপদ চিহ্ন।
সংক্রমণের লক্ষণ চিনুন
WHO-র শিশু-স্বাস্থ্যকর্মীদের নির্দেশিকায় (IMCI) নবজাতক পরীক্ষার সময় নাভি লাল হয়েছে কি না বা পুঁজ বের হচ্ছে কি না, আর ত্বকে পুঁজভরা গোটা আছে কি না, তা দেখতে বলা হয়েছে। বাড়িতেও আপনি এগুলো খেয়াল রাখতে পারেন।
এ ছাড়া WHO জন্মের পর অন্তত চারবার মা ও শিশুর চেকআপের পরামর্শ দেয়: প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে, ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যে, ৭ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে, আর ষষ্ঠ সপ্তাহে। এসব চেকআপে স্বাস্থ্যকর্মী নাভি, ত্বক আর শিশুর সার্বিক অবস্থা দেখেন। চেকআপের ফাঁকে বাড়িতে কোনো বিপদ চিহ্ন দেখলে পরের চেকআপের অপেক্ষা না করে তখনই যান।
এই লেখা শুধু সাধারণ তথ্যের জন্য, ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শের বিকল্প নয়। সম্পূর্ণ সতর্কতা
সূত্র
- WHO – Recommendations on maternal and newborn care for a positive postnatal experience (2022) — WHO
- WHO postnatal care guideline – Implementation considerations (NCBI Bookshelf) — WHO
- WHO – Recommendations on postnatal care of the mother and newborn (2013) — WHO
- WHO – Chlorhexidine 7.1% digluconate aqueous solution or gel: reports of serious eye injury due to errors in administration (28 August 2020) — WHO
- WHO – Newborn mortality (fact sheet) — WHO
- WHO – Integrated Management of Childhood Illness (IMCI) chart booklet (March 2014) — WHO