প্রথম ছয় মাস শুধু বুকের দুধ কেন
জন্ম থেকে পুরো ছয় মাস শিশুকে শুধু মায়ের বুকের দুধ দিন, এমনকি এক ফোঁটা পানিও নয়।
প্রথম ছয় মাস শিশুর যা যা দরকার, সবই মায়ের দুধে আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ আর বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর একমত: এই সময়ে শিশুকে অন্য কোনো খাবার বা পানীয় দেবেন না। চলুন সহজ ভাষায় দেখি, কেন।
“শুধু বুকের দুধ” মানে কী
শুধু বুকের দুধ মানে শিশু কেবল মায়ের দুধই পাবে। মায়ের বুক থেকে সরাসরি, অথবা হাতে বের করে রাখা মায়ের দুধ।
- পানি, মধু, চিনি-পানি, গ্লুকোজ দেবেন না।
- গরুর দুধ, অন্য দুধ, সুজি বা অন্য কোনো খাবার দেবেন না।
- ব্যতিক্রম শুধু তিনটি: খাবার স্যালাইন (ওআরএস), ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীর দেওয়া ভিটামিন বা খনিজের ফোঁটা/সিরাপ, এবং ওষুধ।
বাংলাদেশের নির্দেশিকা অনুযায়ী এই সময়টা হলো জন্ম থেকে ১৮০ দিন পর্যন্ত।
গরমে কি পানি লাগবে না?
আমাদের দেশে গরমকালে অনেকেই ভাবেন, শিশুর পিপাসা পায়, তাই পানি দেওয়া দরকার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশিকা বলছে, দরকার নেই। খাওয়ানোর শুরুতে যে পাতলা দুধ আসে, তাতে প্রচুর পানি থাকে। তাই প্রচণ্ড গরমেও ছয় মাসের কম বয়সী শিশুর আলাদা পানির দরকার হয় না। শিশুর পিপাসা মনে হলে আরও বেশিবার বুকের দুধ দিন।
শিশুর কী উপকার হয়
- অসুখ থেকে সুরক্ষা: WHO বলছে, শুধু বুকের দুধ পাওয়া শিশুর ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া কম হয়। এই দুটি অসুখ শিশুমৃত্যুর বড় কারণ।
- জীবন বাঁচায়: যেসব শিশু আংশিক বুকের দুধ পায় বা একেবারে পায় না, তাদের ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ও অন্য সংক্রমণে মারা যাওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি।
- পরের জীবনেও লাভ: বুকের দুধ খাওয়া শিশুদের পরে অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার ঝুঁকি কম থাকে। বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষাতেও তারা ভালো করে।
বোতলে খাওয়ালে উল্টো ঝুঁকি বাড়ে। নির্দেশিকা বলছে, বোতলের মাধ্যমে জীবাণু ঢুকে ডায়রিয়া, এমনকি দীর্ঘমেয়াদি ডায়রিয়াও হতে পারে।
মায়ের কী উপকার হয়
- স্তন ও ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের ঝুঁকি কমে।
- ছয় মাসের কম বয়সী শিশুকে শুধু বুকের দুধ দিলে শরীরে কিছু হরমোনের পরিবর্তন হয়, যা আবার গর্ভধারণ দেরি করাতে পারে। তবে পরিবার পরিকল্পনার জন্য স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে কথা বলুন।
- আলাদা করে দুধ বা বোতল কেনার খরচ লাগে না।
দুধ কম মনে হলে কী করবেন
অনেক মা ভাবেন, তাঁর দুধ যথেষ্ট হচ্ছে না। নির্দেশিকা বলছে, মায়ের দুধের পরিমাণ মূলত নির্ভর করে কতবার শিশু দুধ টানছে আর স্তন কতটা খালি হচ্ছে, তার ওপর। মা কী বিশেষ খাবার খাচ্ছেন, তার ওপর নয়।
- দিনরাত যখনই শিশু চায়, খাওয়ান।
- এক পাশের দুধ শেষ করে, শিশু নিজে ছেড়ে দিলে, তারপর অন্য পাশ দিন।
- শিশু ঠিকমতো বুকে লাগছে কি না খেয়াল করুন।
শিশু যথেষ্ট দুধ পাচ্ছে কি না বোঝার একটা সহজ উপায় আছে। বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান (আইপিএইচএন) ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রথম কয়েক দিন পরে যথেষ্ট দুধ পাওয়া শিশু ২৪ ঘণ্টায় সাধারণত ৬ থেকে ৮ বার বা তার বেশি পাতলা, হালকা রঙের প্রস্রাব করে। সে ভালো ঘুমায় এবং ওজন বাড়ে।
মায়ের নিজের যত্নও জরুরি। দুধ খাওয়ানো মায়ের বেশি খাবার লাগে। পরিবারের সবাই মিলে নিশ্চিত করুন, মা যেন পেট ভরে নানা রকম খাবার খান, পিপাসা মিটিয়ে পানি পান করেন এবং বিশ্রাম পান।
কর্মজীবী মায়েরা হাতে দুধ বের করে পরিষ্কার পাত্রে রেখে যেতে পারেন। কীভাবে বের করবেন ও রাখবেন, তা স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে শিখে নিন। শিশুকে সেই দুধ কাপ বা চামচে খাওয়ানো যায়, বোতলে নয়।
বিজ্ঞাপনে বিভ্রান্ত হবেন না
বাংলাদেশে বুকের দুধের বিকল্প খাবারের বিপণন নিয়ন্ত্রণে ২০১৩ সালে আইন হয়েছে, আর আন্তর্জাতিকভাবে WHO-র একটি বিপণন বিধিও (কোড) আছে। মায়ের দুধের কোনো সমান বিকল্প নেই। কোনো সমস্যা হলে আগে ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নিন।
এই লেখা শুধু সাধারণ তথ্যের জন্য, ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শের বিকল্প নয়। সম্পূর্ণ সতর্কতা
সূত্র
- WHO – Infant and young child feeding (fact sheet) — WHO
- WHO – Breastfeeding (health topic) — WHO
- UNICEF – From the First Hour of Life (2016) — UNICEF
- IPHN/DGHS Bangladesh – Clinical Guidelines on Infant and Young Child Feeding (IYCF) — IPHN
- WHO – International Code of Marketing of Breast-milk Substitutes — WHO