শিশুর ডায়রিয়া: খাবার স্যালাইন ও জিংক
শিশুর ডায়রিয়া হলে খাবার স্যালাইন (ওআরএস) আর ১০ থেকে ১৪ দিন জিংক দিন, বুকের দুধ ও খাবার চালিয়ে যান, আর বিপদ চিহ্ন দেখলে দেরি না করে হাসপাতালে যান।
ডায়রিয়া পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ, কিন্তু এটা প্রতিরোধ ও চিকিৎসা দুটোই করা যায়। সবচেয়ে বড় বিপদ হলো শরীর থেকে পানি ও লবণ বেরিয়ে যাওয়া, অর্থাৎ পানিশূন্যতা। WHO ও ইউনিসেফ বলছে, ঘরে খাবার স্যালাইন আর জিংক দিলে, এবং খাওয়ানো চালিয়ে গেলে, বেশিরভাগ শিশু সেরে ওঠে।
ডায়রিয়া কাকে বলে
- দিনে তিন বা তার বেশি বার পাতলা বা পানির মতো পায়খানা হলে, বা শিশুর স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশিবার হলে, তাকে ডায়রিয়া বলে।
- শুধু বুকের দুধ খাওয়া শিশুর নরম, পেস্টের মতো পায়খানা ডায়রিয়া নয়। এটা স্বাভাবিক।
- পায়খানায় রক্ত গেলে তাকে আমাশয় বলে। এতে ডাক্তার দেখাতে হয়।
পানিশূন্যতা চিনবেন কীভাবে
WHO পানিশূন্যতাকে তিন ভাগে ভাগ করে। শিশুকে ভালো করে খেয়াল করুন:
- কিছুটা পানিশূন্যতা (এগুলোর মধ্যে দুই বা তার বেশি লক্ষণ): শিশু অস্থির বা খিটখিটে, চোখ বসে গেছে, খুব পিপাসা নিয়ে আগ্রহ করে পান করছে, পেটের চামড়া চিমটি দিয়ে ছাড়লে ধীরে ফেরে। এ অবস্থায় দ্রুত স্বাস্থ্যকর্মী বা ডাক্তারের কাছে যান।
- মারাত্মক পানিশূন্যতা (অন্তত দুটি লক্ষণ): শিশু নিস্তেজ বা অচেতন, চোখ বসে গেছে, পান করতে পারছে না বা খুব কম পান করছে, পেটের চামড়া চিমটি দিয়ে ছাড়লে খুব ধীরে (২ সেকেন্ডের বেশি সময়ে) আগের জায়গায় ফেরে। এটা জরুরি অবস্থা। শিশুর শিরায় স্যালাইন লাগতে পারে, তাই এখনই হাসপাতালে নিন।
- এসব লক্ষণ না থাকলে ঘরে ওআরএস, জিংক আর খাবার দিয়ে যত্ন নিন, আর শিশুকে চোখে চোখে রাখুন।
খাবার স্যালাইন (ওআরএস): কীভাবে, কতটুকু
ওআরএস শরীরের হারানো পানি ও লবণ ফিরিয়ে দেয়। ডায়রিয়া শুরু হলেই দেওয়া শুরু করুন।
- প্যাকেটের গায়ে যে পরিমাণ পরিষ্কার পানির কথা লেখা আছে, ঠিক ততটুকু পানিতে পুরো প্যাকেট গুলিয়ে নিন। কম-বেশি করবেন না। আন্দাজে না ঢেলে মাপ দাগ দেওয়া পাত্রে পানি মেপে নিন। এমন পাত্র না থাকলে স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে বাড়ির কোনো পাত্রে মাপের দাগ দেওয়া শিখে নিন।
- প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর, এবং মাঝেও, দিন:
- দুই বছরের কম বয়সী শিশু: প্রতিবার ৫০ থেকে ১০০ মিলিলিটার।
- দুই বছর বা তার বেশি: প্রতিবার ১০০ থেকে ২০০ মিলিলিটার।
- কাপ বা চামচে অল্প অল্প চুমুকে দিন।
- শিশু বমি করলে ১০ মিনিট অপেক্ষা করুন। তারপর আবার দিন, তবে আরও ধীরে।
- ডায়রিয়া পুরোপুরি না থামা পর্যন্ত বাড়তি তরল দিতে থাকুন।
জিংক: ১০ থেকে ১৪ দিন
WHO ও ইউনিসেফের যৌথ নির্দেশনা অনুযায়ী জিংক ডায়রিয়ার সময়কাল ও তীব্রতা কমায়। আর পরের দুই-তিন মাসে আবার ডায়রিয়া হওয়ার ঝুঁকিও কমায়।
- ছয় মাসের কম বয়সী শিশু: দিনে ১০ মিলিগ্রাম, ১০ থেকে ১৪ দিন।
- ছয় মাস বা তার বেশি: দিনে ২০ মিলিগ্রাম, ১০ থেকে ১৪ দিন।
- ছোট শিশুর জন্য ট্যাবলেট চামচে অল্প বুকের দুধ, ওআরএস বা পরিষ্কার পানিতে গুলিয়ে দিন। বড় শিশু চিবিয়েও খেতে পারে।
- ডায়রিয়া থেমে গেলেও পুরো কোর্স শেষ করুন।
জিংক কোন ফর্মে, কতটুকু করে দেবেন, তা অবশ্যই ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে নিশ্চিত হয়ে নিন। WHO ও ইউনিসেফের যৌথ নির্দেশনা বলছে, শিশুকে ডায়রিয়া বন্ধের ওষুধ দেওয়া যাবে না, আর অ্যান্টিবায়োটিক লাগে শুধু বিশেষ ক্ষেত্রে, যেমন পায়খানায় রক্ত গেলে, ডাক্তারের সিদ্ধান্তে। বমি বন্ধের ওষুধসহ অন্য কোনো ওষুধও ডাক্তার না বললে নিজে থেকে দেবেন না।
খাওয়ানো চালিয়ে যান
ডায়রিয়ার সময় খাবার বন্ধ করলে শিশু আরও দুর্বল হয়, অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়ে।
- বুকের দুধ খাওয়া শিশুকে আরও ঘন ঘন ও বেশি সময় ধরে বুকের দুধ দিন।
- ছয় মাসের বেশি বয়সী শিশুকে নরম, পছন্দের খাবার অল্প অল্প করে বারবার দিন।
- সেরে ওঠার পর কিছু দিন বাড়তি খাবার দিন, যেন হারানো ওজন ফিরে আসে।
ডায়রিয়া প্রতিরোধে যা করবেন
- প্রথম ছয় মাস শুধু বুকের দুধ খাওয়ান।
- নিরাপদ পানি পান করান, খাবার পরিষ্কারভাবে রান্না ও ঢেকে রাখুন।
- পায়খানার পর, শিশুর পায়খানা পরিষ্কারের পর, রান্নার আগে ও খাওয়ানোর আগে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন।
- স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার করুন।
- ইপিআই সময়সূচি অনুযায়ী শিশুর সব টিকা সময়মতো দিন।
এই লেখা শুধু সাধারণ তথ্যের জন্য, ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শের বিকল্প নয়। সম্পূর্ণ সতর্কতা
সূত্র
- WHO – Diarrhoeal disease (fact sheet) — WHO
- WHO/UNICEF – Clinical management of acute diarrhoea: joint statement (2004) — WHO
- WHO/UNICEF/USAID – Diarrhoea treatment guidelines including new recommendations for the use of ORS and zinc supplementation for clinic-based healthcare workers (2005) — WHO
- WHO – Integrated Management of Childhood Illness (IMCI) chart booklet (March 2014) — WHO
- WHO – Integrated Management of Childhood Illness (IMCI) distance learning course (2014) — WHO
- IPHN/DGHS Bangladesh – Clinical Guidelines on Infant and Young Child Feeding (IYCF) — IPHN